প্রিন্ট এর তারিখঃ Aug 12, 2026 ইং || প্রকাশের তারিখঃ Aug 12, 2026 ইং
লেবাননের বনভূমিও পুড়িয়ে ছাই করছে ইসরায়েল

দক্ষিণ লেবাননের বনাঞ্চল, জলপাই বাগান এবং কৃষিজমিতে একের পর এক আগুন লাগিয়ে অঞ্চলটিকে বসবাসের অযোগ্য করে তোলার অভিযোগ উঠেছে ইসরায়েলি বাহিনীর বিরুদ্ধে। পরিবেশবাদী সংস্থা ও স্থানীয় অধিবাসীদের মতে, কেবল সামরিক লক্ষ্যবস্তুই নয় বরং কৌশলগতভাবে পুরো বাস্তুতন্ত্র ধ্বংস করতে ইসরায়েল এ ধরনের পদ্ধতি গ্রহণ করেছে, যাকে পরিবেশকর্মীরা ‘পরিবেশগত গণহত্যা’ (ইকোসাইড) হিসেবে বর্ণনা করছেন।
দক্ষিণ লেবাননের নাবাতিয়াহ অঞ্চলের বেসামরিক প্রতিরক্ষা বিভাগের প্রধান হুসেইন ফাকিহ জানান, সেখানে বর্তমানে দমকল বাহিনীর মূল কাজই হয়ে দাঁড়িয়েছে ইসরায়েলি গোলার আঘাতে ছড়িয়ে পড়া আগুন নেভানো। তিনি অভিযোগ করেন, সীমান্ত উত্তেজনার সুযোগে প্রতিদিনই ইসরায়েলি ড্রোন থেকে দাহ্য পদার্থ ও সাদা ফসফরাস শেল ফেলা হচ্ছে, যা শুষ্ক বনভূমি ও ফসলি জমিতে মুহূর্তে ব্যাপক দাবানল সৃষ্টি করছে।
আগুন নেভাতে যাওয়া উদ্ধারকর্মীদের ওপরও ইসরায়েলি বাহিনী হামলা চালাচ্ছে বলে দাবি করা হয়েছে। বিভিন্ন উদ্ধারকারী দল জানিয়েছে, খিয়াম এলাকায় আগুন নেভানোর সময় ফায়ারফাইটারদের লক্ষ্য করে ড্রোন হামলা চালানো হয়, যার ফলে তারা পিছু হটতে বাধ্য হন। তা ছাড়া, ইসরায়েলি সামরিক সামরিক কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে অনুমতি না পাওয়ায় আগুন ছড়িয়ে পড়া বহু জায়গায় সময়মতো পৌঁছানোই উদ্ধারকারীদের পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না।
কেবল একটি বা দুটি নির্দিষ্ট সীমান্ত এলাকা নয় বরং সাম্প্রতিক সময়ে কাফরশুবা, জেজ্জিন এবং পশ্চিম বেকা উপত্যকার মধ্যবর্তী ঘন বনাঞ্চলেও বড় ধরনের দাবানল দেখা গেছে। স্থানীয় সিভিল ডিফেন্স স্টেশনগুলোর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ড্রোনের মাধ্যমে নিক্ষিপ্ত রাসায়নিক ও ফ্লেয়ারের কারণে দিনভর অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে, যা নিয়ন্ত্রণ করতে উদ্ধারকর্মীদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা লড়াই করতে হচ্ছে।
লেবাননের পরিবেশবাদী সংগঠন ‘গ্রিন সাউদার্নার্স’-এর প্রতিষ্ঠাতা হিশাম ইউনুস উল্লেখ করেন, দক্ষিণ লেবাননের প্রাচীন পাইন ও ওক গাছের বনগুলো কেবল স্থানীয় মানুষের জীবিকাই নয় বরং এটি হাজারও অভিবাসী পাখির চলাচলের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রজনন ও বিশ্রামস্থল। এসব প্রাকৃতিক সম্পদ ধ্বংসের ফলে দীর্ঘমেয়াদে পুরো অঞ্চলের বাস্তুতন্ত্র মারাত্মক হুমকিতে পড়েছে এবং প্রকৃতির নিজস্ব পুনর্জন্মের ক্ষমতাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ এবং স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, এই পরিবেশগত হামলার চিত্রটি নতুন নয়। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া সংঘাতের পর থেকে বিভিন্ন সময়ে ইসরায়েলি বাহিনীকে বিতর্কিত নানা কৌশল ব্যবহার করতে দেখা গেছে। এর মধ্যে মধ্যযুগীয় ট্রেবুচেট বা ক্যাটাপল্ট দিয়ে আগুনের গোলক নিক্ষেপ, ড্রোন দিয়ে বনভূমিতে তরল দাহ্য পদার্থ ছিটানো এবং কৃষি জমিতে ক্ষতিকারক আগাছানাশক কেমিক্যাল স্প্রে করার মতো ঘটনাও ঘটেছে।
সীমান্তে অবস্থিত ইয়ারুন গ্রামের মতো এলাকাগুলোতে এই ধ্বংসযজ্ঞের মাত্রা সবচেয়ে মারাত্মক রূপ নিয়েছে। ইয়ারুন গ্রামের মেয়র হাফেজ ঘাশাম এবং বাস্তুচ্যুত বাসিন্দারা কৃত্রিম উপগ্রহের ছবির মাধ্যমে জানতে পারেন যে, তাদের পুরো গ্রাম গুঁড়িয়ে দেওয়ার পর পূর্বপুরুষদের রেখে যাওয়া শতবর্ষী প্রাচীন জলপাই বাগানগুলোতেও আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে। এটি কেবল কৃষি বা অর্থনৈতিক ক্ষতি নয় বরং শত বছরের ঐতিহ্য ও অস্তিত্ব ধ্বংসের শামিল।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, এই ধরনের ভূমি ধ্বংসের মূল লক্ষ্য হলো লেবাননের সীমান্তবাসীদের নিজেদের ভিটামাটি থেকে চিরতরে বিতাড়িত করা। ইতিহাস, ঐতিহ্য ও হাজার বছরের সংস্কৃতি মুছে ফেলে অঞ্চলটিকে সম্পূর্ণ জনমানবহীন ও অকার্যকর মরুভূমিতে পরিণত করার এক পরিকল্পিত উদ্যোগ চালানো হচ্ছে বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ভুক্তভোগীরা।
সূত্র: আল মায়াদিন
এই ওয়েবসাইটের সকল ছবি ও ভিডিও অনুমতি ব্যতীত ব্যবহার করা নিষেধ। উক্ত নিউজ পোর্টালটির নিবন্ধন কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন আছে।